বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচার কখন শুরু!

রাত এগারোটায় জানতে পারলাম আগামীকাল ঈদ। কুড়িগ্রামে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। চাঁদের কথা বলতেই মনে হলো কোথাও এরকম একটা কিছু পড়েছি-৬১৭ খ্রি. ১৪ রজব বৃহস্পতিবার প্রিয়নবী সা. আঙুলের ইশারায় চাঁদ দু’ভাগ হতে দেখে ক্যারালার রাজা চেরুমল ওরফে ‘রাজাভোজ’ মুসলমান হয়েছিলেন এবং তিনিই ভারতীয় সর্বপ্রথম মুসলমান। এতে বোঝা যায় প্রিয়নবী সা. এর জীবদ্দশায় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। শায়খ যাইনুদ্দীন তাঁর রচিত গ্রন্হ ‘তুহফাতুল মুজাহিদীনে’ লিখেন যে ভারতের তামিল ভাষার প্রাচীন গ্রন্হে উল্লেখ রয়েছে যে একদল আরব জাহাজে চড়ে মালাবার এসেছিলেন। তাঁদের প্রভাবে রাজা চেরুমল ইসলাম গ্রহণ করেন। অতপর মাক্কায় গিয়ে তিনি কিছুকাল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) এর সান্নিধ্যে থাকেন।

বাংলাদেশে ইসলামের সূচনার সময় নির্ধারণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেন। অনেকের মতে ১২০৩-১২০৪ খ্রিস্টাব্দে উপমহাদেশ দাপিয়ে বেড়ানো আফগানিস্তানের প্রতাপশালী মুসলিম শাসক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজির শাসনামল থেকে বাংলাদেশে ইসলামের সূচনা হয়। জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফের মতে, হজরত ওমর রা. এর শাসনামলে মামুন, মুহাইমেন রা. নামক সাহাবিদ্বয় বাংলাদেশে আগমন করেন। বিশিষ্ট সাহাবি আবু ওয়াক্কাস রা. ৩য় হি. (৬২৬ খ্রি.) ইসলাম প্রচারের জন্য চীন যাওয়ার পথে কিছুকাল রংপুর এলাকায় অবস্থান করে ইসলাম প্রচার করেন, বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়। ১৯৮৭ সালে উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম রংপুরের লালমনিরহাটে আবিষ্কৃত ৬৯ হিজরির (আনুমানিক ৬৯২ খ্রি.) পূর্ণ একটি মসজিদের ভিত ও স্পষ্ট আরবি অক্ষরের লেখা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরী ৬৯” খচিত একটি শিলালিপি তাদের সে ধারণাকে বদলে দিয়েছে। এই নিদর্শন পাওয়ার পূর্বে ধারণা করা হতো, শুধুমাত্র বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলেই প্রাচীনকালে আরবদের আগমন ঘটেছিল । বিচ্ছিন্নভাবে ৬৯ হিজরির আগেও বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

আরব ভূগোলবিদগণের বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে আরব বণিকগণ তাদের বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম আসতেন এবং মসলা, হাতীর দাঁত, চন্দন কাঠ ইত্যাদি সামগ্রী সংগ্রহ করতেন। উম্মুল মোমেনিন মা খাদিজা রা. এর বাণিজ্যিক জাহাজও চট্টগ্রামে নোঙর ফেলেছিল এবং দক্ষিণ আরবের ‘সাবা’ জাতি ঢাকার অদূরে বসতি গড়লে তার নাম হয়ে যায় সাভার। ঠিক তখন থেকেই বাংলাদেশে আরবদের আগমন শুরু হয় এবং তাদের মাধ্যমেই ইসলামের সূচনা হয়। তবে তখন ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচার হয়নি। খৃষ্টীয় ৭৫০ সনে বাংলাদেশে পাল বংশের রাজত্ব শুরু হয়। আর খৃষ্টীয় ৭৫০ সনেই বাগদাদে বানুল আব্বাস খিলাফাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মপাল যখন বাংলাদেশের শাসক তখন বাগদাদের শাসক ছিলেন বাদশা হারুনুর রশীদ। রাজশাহীর পাহাড়পুরে বৌদ্ধ বিহার খননকালে একটি আরবী মুদ্রা পাওয়া যায়। এই মুদ্রাটি তৈরী হয়েছে ৭৮৮ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ হারুনুর রশীদের শাসনকালে। কুমিল্লা জিলার ময়নামতিতে অনুরূপ খননকার্য কালে বানুল আব্বাস যুগের দুইটি মুদ্রা পাওয়া যায় (হিষ্ট্রি অব দ্যা মুসলিমস অব বেঙ্গল, ডঃ মুহাম্মদ মোহর আলী, পৃষ্ঠা-৩৮)। এইসব মুদ্রাপ্রাপ্তি এই কথাই প্রমাণ করে যে খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে বাংলাদেশে আরব মুসলিমদের যাতায়াত ছিলো। পরবর্তীতে ১২০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পর থেকেই ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসার আরম্ভ হয়। ১৩০৩ সালে বিখ্যাত ওলী হযরত শাহজালাল ইয়ামানী রহ. তিনশত ষাট জন সাথী নিয়ে সিলেট আগমন করেন। সিলেট বিজয়ের পর হযরত শাহজালাল রহ. তাঁর সাথীদের নিয়ে সিলেট অঞ্চলে থেকে যান। তাঁর উন্নত চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে বাংলার হাজার হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন।

মুহাদ্দিম ইমাম আবাদান মারওয়াযীর গ্রন্হ থেকে জানা যায় যে, মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ (সা) এর সাহাবী আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা) নবুওয়াতের পঞ্চম সনে (অর্থাৎ খৃষ্টীয় ৬১৫ সনে) হাবশায় (ইথিয়পিয়ায়) হিজরাত করেন। নবুওয়াতের সপ্তম সনে (অর্থাৎ খৃষ্টীয় ৬১৭ সনে) তিনি কায়েস ইবনু হুযাইফা (রা), উরওয়াহ ইবনু আছাছা (রা), আবু কায়েস ইবনুল হারিস (রা) এবং কিছু সংখ্যক হাবশী মুসলিমসহ দুইটি জাহাজে করে চীনের পথে সমুদ্র পাড়ি দেন। দীর্ঘপথে পালে-টানা জাহাজের একটানা সফর সম্ভবপর ছিলোনা। পথে যেইসব মানযিল বা বন্দর ছিলো সেইগুলিতে আবশ্যিকভাবে থেকে জাহাজ মেরামত এবং পরবর্তী মানযিলের জন্য রসদ সংগ্রহ করতে হতো। চীন যাবার পথে তাঁকে বাংলাদেশের বন্দরগুলোতেও নোঙ্গর করতে হয়েছিল। আর তার পবিত্র সাহচর্যে এসে এদেশের কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। চীনের মুসলিমদের বই পুস্তক থেকে জানা যায় যে আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা) তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে খৃষ্টীয় ৬২৬ সনে চীনে পৌছেন। আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা) ক্যান্টন বন্দরে অবস্থান করেন। সমুদ্র তীরের কোয়াংটা মাসজিদ তিনিই নির্মাণ করেন। মাসজিদের নিকটেই রয়েছে তাঁর কবর। অতএব বুঝা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর রাদিআল্লাহুতা‘আলা আনহুর খিলাফত কালের (৬৩৪-৬৪৪ খৃঃ) মধ্যভাগ নাগাদ অর্থাৎ ৬৪০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ, অবশ্য ৭ম শতাব্দীর বিশেষ দশক থেকে বিশেষ করে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধির পর থেকে বাংলাদেশে ইসলাম এসে যায় ক্ষুদ্র পরিসরে।

প্রিয় নবী সরকারে দো আলম নূরে মুজাসসম হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম প্রথম ওহীপ্রাপ্ত হন ৬১০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি আল্লাহর নির্দেশে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁকে প্রদত্ত নির্দেশে ইরশাদ করেন : আপনি আপনার রব-এর পথে আহ্বান করুন হিকমতের মাধ্যমে এবং সুন্দর সুন্দর উপদেশ দ্বারা আর ওদের সঙ্গে বাক্যালাপ করবেন সৎভাবে (সূরা নহল : আয়াত ১২৫)। মক্কা মুকাররমে তিনি ১২ বছর ধরে মানুষকে আলোর পথে দাখিল হবার জন্য আহ্বান করেন। মক্কার কাফির-মুশরিকদের নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে বাড়তে চরম পর্যায়ে উঠল। তবুও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন করে চললেন। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন করাই ছিল নবীজির কর্তব্য। তিনি আল্লাহর নির্দেশে মদীনা মনওয়ারায় হিজরত করেছেন।
মদীনায় এসে সুন্দর শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করেন। যাকাত, কিবলা পরিবর্তন, উত্তরাধিকার আইন প্রভৃতি বিধান নাজিল হয়। প্রায় দেড় বছরের মাথায় রমাদানকে সিয়ামের জন্য নির্ধারণ করে দিয়ে বিধান নাজিল হয়। রাসূল (সঃ) যখন মদিনায় আগমন করলেন, মদিনা বাসির বিশেষ দুটি দিন ছিলো। এদিনে তারা খেলাধুলা আমোদ-ফুর্তি করতো। রাসূল (সাঃ) জানতে চাইলেন এ দুটি দিনের তাৎপর্য কি? মদিনাবাসি উত্তরে বললেন: আমরা মূর্খতার যুগে এ দু’দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূল (সঃ) বললেন: “আল্লাহ এ দিনের পরিবর্তে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন তোমাদের দিয়েছেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪)। ‘ঈদ’ মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ এক নেয়ামত। সেই রমাদানে প্রথম সিয়াম পালিত হয়েছে রমাদান মাসব্যাপী আর সেই রমাদানের ১৭ তারিখে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ ‘বদরের যুদ্ধ’ মুকাবিলা করে সুদূরপ্রসারী বিজয় এনেছেন ইসলামের অনুসারীরা। এবং সেই রমাদান শেষে ১ শাওয়ালের চাঁদ উদিত হয়েছে সিয়াম ভাঙ্গার আনন্দ উৎসবের বা ঈদ-উল-ফিতরের বার্তা নিয়ে। ১ শাওয়াল সর্বপ্রথম পালিত হলো ঈদ। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ উৎসব আছে, আমাদের আনন্দ উৎসব ঈদ। সর্বপ্রথম ঈদ-উল-ফিতর পালিত হয় দ্বিতীয় হিজরীর ১ শাওয়াল মুতাবিক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ শুক্রবার মদীনা মনওয়ারার মসজিদুন্নবী থেকে ৩০৫ মিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটা ময়দানে। ইমামতি করেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম। যতদূর জানা যায়, মক্কা মুকাররমায় প্রথম ঈদ-উল-ফিতর পালিত হয় ৮ম হিজরী মুতাবিক ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের প্রায় ১১ দিন পর। বাংলাদেশে কোথায় ঈদের জামা‘আত অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা জানা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত করে হয়তো বলা যায় ঈদের প্রথম জামা‘আত অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের তদানীন্তন সমুদ্র বন্দর এলাকার কোন একটিতে।

শতসংযম আর দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর বহুপ্রতীক্ষিত ঈদুল ফিতর আসে। ঈদুল ফিতর এলেই একজোটে বেজে ওঠে টিভি চ্যানেল গুলোতে সব্যসাচী লেখক কাজী নজরুল ইসলামের গান, “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ ; তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ। তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ; দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ।” এই গীতি কবিতা দিয়ে যেন শুরু হয় আমাদের সকল ঈদ অনুষ্ঠান । নজরুলের ‘খুশির ঈদ’ গান ছাড়া বাঙ্গালীর ঈদুল ফিতরের আমেজ যেন অপূর্ণই থেকে যায়। প্রতিবছর ঈদ আসে আমাদের জীবনে আনন্দ, সীমাহীন প্রেম প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে৷ আহ্বান জানায় সকল মলিনতা আর কলুষতাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে, হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে, পরস্পর প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে। ঈদ ধনী-গরিব, বাদশাহ-ফকির, মালিক-শ্রমিক সবার মহামিলনের অনুষ্ঠান।

ঈদ শব্দটি এসেছে ‘আউদ’ শব্দ থেকে যার অর্থ হচ্ছে ফিরে ফিরে আসা, পুনরাবৃত্ত হওয়া, অনুষ্ঠিত রীতির প্রত্যাবর্তন করা। ঈদ মানে আনন্দ যা প্রতিবছর চান্দ্র বর্ষ গণনার হিসেবে ফিরে আসে। ঈদ-উল-ফিতর মানে যেমন সিয়াম ভাঙ্গার আনন্দ উৎসব হয় তেমনি এর মানে দানের উৎসব হয়। কারণ এই ঈদে দরিদ্রজনদের মধ্যে সাদাকাতুল ফিতরা বা ফিতরা বিলাতে হয় যাতে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত মানুষ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। ঈদ-উল-ফিতর ধনী-গরীবের মধ্যে আর্থ-সামাজিক ব্যবধান ও বৈষম্য হীন এক সমাজ গড়ে তোলার তাগিদ দেয় । ঈদের নতুন চাঁদ যেন সকলের কাছে আনন্দময় হয়, সেজন্য গরিব, দুঃখী, অসহায়দের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্যে ইসলামে যাকাত প্রদানের বিধান রয়েছে। যাকাত প্রদান গরীবদের প্রতি ধনীদের অনুগ্রহ নয়, বরং গরীবদের হক বা অধিকার। ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় যাকাত, ফিতরা দেয়া হলে, গরিব-দুঃখি, অসহায়রাও উপভোগ করতে পারবে ঈদানন্দ। সমাজে ধ্বনিত হবে শান্তি সুখের কল্লোল।

ঈদ থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা আমাদের জীবন রাঙাতে পারি, তবেই আমাদের ঈদ উৎসব স্বার্থক হবে। ঈদ এলে আমরা যেভাবে ধনী-গরীব, বাদশা-ফকিরের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে যাই, সারা বছরের জন্য সেই ভেদাভেদের দেয়ালকে উপড়ে ফেলতে হবে। কবি গোলাম মোস্তফার ভাষায়-

“আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লাভিয়াছে হর্ষে
আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়াছে রাখিতে হবে সারা বর্ষে
এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য, নিখিল মানবের মিলন জন্য
শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশীষ স্পর্শে।”

যদিও ঈদ মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, তবে তা একাকার হয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে। ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মাসিক ‘নবনূর’ পত্রিকার ঈদসংখ্যায় সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা প্রকাশিত হয়। ঈদ নিয়ে যা ছিলো মুসলিম বাংলার প্রথম কবিতা। কবিতাটির প্রথম দুটি স্তবক হলো:

“কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়া যেন কয়ে যায়
মুসলিম জাহান আজি একতায়
দেখ কত বল ধরে?”

আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁরই ইবাদতের জন্য। মানুষ পৃথিবীতে আসার বহু পূর্বে সব মানুষের রূহ সমবেত করে তাদের কাছ থেকে সেই আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগতে আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু শপথ গ্রহণ করিয়েছিলেন। তিনি সমস্ত রূহ্ বা আত্মাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: আমি কি তোমাদের রব্ নই? সব আত্মাই একবাক্যে বলেছিল: হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব্। এই অঙ্গীকারাবদ্ধ মানব রূহ্ বিশেষ আকৃতির দৈহিক কাঠামোতে অবস্থান নিয়ে আল্লাহর বিধান মুতাবিক এই পৃথিবীতে আসে মাতৃগর্ভরূপী জাহাজে করে আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি হিসেবে । আল্লাহর কাছে সে যে অঙ্গীকার করেছিল পৃথিবীতে এসে তা রক্ষা করার মধ্যেই মানব জীবনের সার্থকতা। ঈদ-উল-ফিতর সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আল্লাহ জাল্লাশানুহু ইরশাদ করেন: হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক তাকওয়া অবলম্বনকারী। আল্লাহ সব জানেন, সব খবর রাখেন (সূরা হুজুরাত : আয়াত ১৩)। তাকওয়া হচ্ছে ভালো-মন্দ বেছে বেছে চলা, ভালোকে গ্রহণ করা এবং মন্দকে বর্জন করা এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ও রসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করা। মাহে রমাদানে রোযাদার তাকওয়া অবলম্বনের প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বনে অভ্যস্ত হয়। ঈদ-উল-ফিতর, মাহে রমাদানে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ বছরের বাকি এগারোটা মাসে কাজে লাগানোর শপথে বলীয়ান হবার দিন। আর সেই শপথ পূরণের মাধ্যমেই দূর হবে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য । এই বৈষম্য বিদূরিত হলেই ঈদ হবে প্রকৃত আনন্দদায়ক, প্রশান্তিদায়ক। সবার হৃদয় রাঙিয়ে দেবে প্রেম-প্রীতি ও শান্তির পরশে। কবি মতিউর রহমান তার গানে লিখেন-
“ঈদের খুশি অপূর্ণ রয়ে যাবে ততদিন,
খোদার হুকুমাত হবে না কায়েম
কায়েম হবে না যতদিন।”

খুব ছোট্ট বেলায় একটা জমির দলিলে দেখতে পেয়েছিলাম দাতা আর গ্রহীতার নামের পাশে শ্রী শব্দটি যুক্ত রয়েছে। আব্বাকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, শ্রদ্ধা ভক্তি প্রকাশের জন্য অতীতে জীবিত ব্যক্তির নামের পুর্বে কিংবা নিজের নাম স্বাক্ষরের পুর্বে লেখা হতো। এসব বঙ্গদেশীয় সম্বোধন শব্দ, অন্যকিছু বুঝায়না । এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে, সম্মানসূচক সম্বোধন শব্দ হিসেবে সবার জন্যে জনাব লেখা হয়। তারপর জিজ্ঞেস করলাম এই বঙ্গদেশে ইসলাম ধর্মের প্রচার কখন শুরু হয়। তিনি উত্তরে বললেন যেহেতু আমাদের প্রিয় নবী বিশ্ব নবী ছিলেন তাহলে তাতো সাথে সাথেই হওয়ার কথা। এবিষয়ে অবশ্য তিনি কোন রেফারেন্স দিলেন না। তখন রেফারেন্স কি জিনিষ বুঝতামনা। বাবাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতাম। একজন আদর্শ বাবাই একজন সন্তানের সবচেয় নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স। এই মুহূর্তে বাবা আর কাছে নেই। আমার সম্মুখে আছে বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের লেখনি ও রেফারেন্স । ভাবলাম, এইগুলিকে সংকলন করলে কেমন হয়? বৃষ্টিস্নাত ঈদে হাজার দশেক শব্দ পড়ে মনে হলো মুক্ত মনে নিজে কিছু লিখেই ফেলি। আর তা থেকে কিছুটা সকলের সাথে শেয়ার করি। ঈদের দিনে কার কাছে কেমন লাগবে এবং কে কি ভাববে জানিনা। তবে এসব পড়ে কারো ঈদ আনন্দ মাটি করার কিছু নেই।

এজন্য আগে ভাগেই ক্ষমা চেয়ে নেই ভাই।
আর পাখীর মতো হয়ে যাই।
সুরেলা – বেসুরেলা গলায় গেয়ে যাই।
ঈদ মোবারক,ঈদ মোবারক,
ঈদ মোবারক ভাই,
ভালবাসা ও প্রীতিতে ঈদের,
শুভেচ্ছা জানাই,
তোমাদের সবাইকে,
সব বন্ধুকে,
সকল বড়-ছোট ভাইকে।
ঈদ মোবারক জানাই।।